চায়ের দোকান থেকে ডেকে মা চায়ের দোকান থেকে ডেকে মা

CPM NETWORK

Cpm Network

চায়ের দোকান থেকে ডেকে মাদক মামলা দেওয়ার অভিযোগ

সমকালের পাতা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৫
চায়ের দোকান থেকে ডেকে মা

চায়ের দোকান থেকে ডেকে মাদক মামলা দেওয়ার অভিযোগ মো. ইস্তেখারের স্ত্রী ও বৃদ্ধ মার।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় কৃষি মার্কেট সংলগ্ন সড়কের পাশের গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন মাংস ব্যবসায়ী  মো. ইস্তেখার। হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে এক দল পুলিশ তাকে বলেন, ‘কথা আছে , চল আমাদের সঙ্গে।’ পরে পাশের একটি জায়গায় নিয়ে আটকে রাখা হয় তাকে। রাতে সেখান থেকে তাকে নেওয়া হয় মোহাম্মদপুর থানা হাজতে।

এরপর মাদক মামলা দিয়ে তাকে শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) সকালে আদালতে পাঠানো হয়।

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এভাবে হঠাৎ গ্রেপ্তার হওয়ায় তার স্ত্রী, বৃদ্ধ মা ও শিশু সন্তানরা আছেন চরম আতঙ্কে।

ইস্তেখারের স্ত্রী আয়েশা আক্তার কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘আমার স্বামী একজন মাংস ব্যবসায়ী। তিনি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত না।

তাকে চায়ের দোকান থেকে কথা আছে বলে ডেকে নিয়ে মাদক মামলা দেয় পুলিশ। পুলিশ এখনও এভাবে মানুষকে হয়রানি করছে! সন্তানদের নিয়ে কিভাবে চলবো, সন্তানদের লেখাপড়া, খাবার, সংসার কিভাবে চলবে…?

আয়েশা আক্তার বলেন, ‘স্বামীকে থানা হাজতে আটকে রেখে মানসিক নির্যাতন করেছে পুলিশ। সারারাত তিন শিশু সন্ত্রান ও বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে আমি মোহাম্মদপুর থানার সামনে অপেক্ষা করি। কতবার পুলিশ সদস্যদের হাতে পায়ে ধরেছি।

তাদের বলেছি, ‘ও পুলিশ স্যার আমার স্বামী নির্দোষ, তারা আমার কোনো কথাই শোনেনি। আমার বৃদ্ধা শাশুড়িও তাদের কত হাতে পায়ে ধরে বলে আমার ছেলে নির্দোষ, তার কথাও শোনেনি।’

পারিবারিক সূত্র জানায়, ইস্তেখারের দুই সন্তান স্কুল শিক্ষার্থী। জেনেভা ক্যাম্পের স্থায়ী বাসিন্দা তিনি। মাংস ব্যবসার টাকায় পরিবারের মুখে আহাড় যোগান তিনি।

ক্যাম্প এলাকায় নিজের বাড়িতে থাকেন। জেনেভা ক্যাম্পের অন্তত ১৫ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইস্তেখার কোনো অপরাধে জড়িত নয়। সহজ সরল। ক্যাম্পে মাদক কারবারীদের বিপক্ষে তার অবস্থান।

স্থানীয় আব্বাস নামে একজন বলেন, ইস্তেখার এলাকায় মাদক নির্মূলে সব সময় প্রতিবাদ করে আসছে। এ কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা তার শত্রু। এর আগেও তার বিরুদ্ধে থানায় ‘মিথ্যা’ মামলা দেয়। সেই মামলায় জামিনে ছিল। তার মতো ভাল মানুষকে মাদক মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অথচ আসল মাদক ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় তাদের ধরে না পুলিশ। এছাড়া পুলিশের সোর্সরাও ক্যাম্পে মাদক বিক্রি করে। তারাই মূলত পুলিশকে দিয়ে ভাল মানুষকে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু ইস্তেখার নয়, এমন আরো অনেক নিরাপরাধ মানুষকে আটক করে থানায় নিয়ে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।

সরেজমিনে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের চার পাশের গজনবী রোড, বাবর রোড, শাহজাহান রোড ও হুমায়ুন রোড ঘিরে অবাঙালিদের ক্যাম্প, যা জেনেভা ক্যাম্প নামে পরিচিত। এসব সড়কে পুলিশের তল্লাশিচৌকি বা চেকপোস্ট রয়েছে। তবে মাঝখানে ওই ক্যাম্পে দীর্ঘদিন ধরে চলছে রমরমা মাদক কারবার। এলাকায় শতাধিক মাদক খুচরা কারবারী রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে অন্তত ১১ জন শীর্ষ মাদককারবারি। যারা দীর্ঘদিন ধরে ধরাছোয়ার বাইরে রয়েছে। কতিপয় পুলিশ সদস্যকে ‘মোটা অঙ্কের’ টাকা দিয়ে তারা মাদক কারবার করছে বলে সরেজমিনে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

ক্যাম্পের মাদক কারবারীরা এতটাই বেপরোয়া যে, প্রায়ই মাদক ব্যবসার বিরোধের জের ধরে সংঘর্ষে জড়ায়। ৫ আগস্ট পরবর্তী তারা এমন অন্তত ৩০ বারের বেশি প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়। তাদের সংঘর্ষের  সময় সাম্প্রতিক সময়ে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ভোরে ক্যাম্পে সংঘর্ষে ককটেল বিস্ফোরণে জাহিদ হোসেন নামের এক তরুণ নিহত হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে তাকে কারা হত্যা করেছে গত দুই দিনেও পুলিশ নিশ্চিত হতে পারেনি। তিনি রাজধানীর কল্যাণপুরের একটি মোবাইল সার্ভিসিং দোকানে কাজ করতেন। নিহত জাহিদ জেনেভা ক্যাম্পের ইমরানের ছেলে। দুই ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।

নিহতের বন্ধু আফতাব হোসেন বলেন, ‘গভীর রাতে ক্যাম্পে সংঘর্ষ চলছিল। বাসার সামনে থাকা অবস্থায় ককটেল এসে জাহিদের ওপর পড়ে বিস্ফোরিত হয়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন।’

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মো. রফিক আহমেদ বলেন, ‘জাহিদকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পেয়ে তদন্ত চলছে। জেনেভা ক্যাম্পে প্রায়ই মাদকবিরোধী অভিযান চলছে।’

পুলিশের ভাষ্য, গত এক বছরে জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে, গত বৃহস্পতিবার জাহিদের মৃত্যু ছাড়াও গত বছরের ৬ আগস্ট শাহেন শাহ নামের এক যুবক গুলিতে নিহত হন, একই দিনে গলায় গুলিবিদ্ধ হন শুভ নামের এক তরুণ। এরপর ৪ সেপ্টেম্বর সোহেলের গুলিতে মারা যান অটোরিকশাচালক সাদ্দাম হোসেন সনু। গত ৩১ মে ককটেল বিস্ফোরণে মারা যায় রাসেল নামের একটি শিশু। একই বছরের ২২ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা সংঘর্ষে চুয়া সেলিমের স্ত্রী নাগিন বেগম ও চারকো ইরফান গুলিবিদ্ধ হন। গুলিবিদ্ধ সাগর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

অবাঙালিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংগঠনের একজন নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘবদ্ধ মাদক ব্যবসায়ী চক্র দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা করছে। এই চক্রটি মোহাম্মদপুরের ছয়টি অবাঙালি ক্যাম্পেই মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ছাড়া দেশের অন্য অবাঙালি ক্যাম্পগুলোতে এই কারবার চলছে তাদের নিয়ন্ত্রণে।

২০১৬, ১৭ ও ১৮ সালে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পসহ অন্যান্য ক্যাম্পে বড় ধরনের অভিযান চালায় পুলিশ ও র‌্যাব। ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে ‘চল যাই যুদ্ধে’ মাদকের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে বিশেষ অভিযান শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো। তবে বারবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না মাদকের ব্যবসা। আধিপত্য ধরে রাখতে একাধিক অপরাধীগোষ্ঠী নিয়মিত সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। সহযোগীরা ককটেল ও দেশীয় অস্ত্রের মজুদ গড়ে তুলেছে।

সংঘর্ষে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ক্যাম্প : জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের দাবি, কয়েক দিন ধরে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বুনিয়া সোহেল, পিচ্চি রাজা ও চুয়া সেলিম গোষ্ঠীর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হচ্ছে। তাদের সংঘর্ষেই জাহিদ নিহত হয়েছেন।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, একাধিক মামলায় জামিনে থাকা শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, গালকাটা মনু, শাহ আলম, ইমতিয়াজ, পিচ্চি শামির, পিচ্চি রাজা, বড় রাজু, শাহজাদা, টুনটুন ও নাদিম ক্যাম্পের বিভিন্ন অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই চালাচ্ছেন। প্রত্যেকেরই আলাদা গোষ্ঠী রয়েছে, যার সদস্যসংখ্যা ২০ থেকে ৫০ জনের মধ্যে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের পর যৌথ বাহিনীর অভিযানে এসব কারবারিদের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়েছে।

অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে মাদক ব্যবসা, হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা চলছে। নিয়মিত অভিযান হলেও তা নিয়ন্ত্রণে আসছে না এই দায় পুলিশকেই নিতে হবে।’

নিরপরাধদের হয়রানির অভিযোগ : ক্যাম্পবাসীদের অভিযোগ, প্রকৃত অপরাধীরা ধরা না পড়লেও নিরপরাধদের প্রায়ই পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। একজন বাসিন্দা বলেন, ‘যারা প্রকৃত অপরাধী, তাদের পুলিশ ধরতে পারে না। নিরপরাধ ব্যক্তিদের আটক করে থানায় নেয়। আমরা সব সময় আতঙ্কে থাকি।’

পুলিশের ভাষ্য, ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার সঙ্গে অনেকেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত। আর বাসিন্দারা বলছে, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিচ্ছেন মাদক কারবারিরা।

মাদক কারবারের পেছনে জটিল নেটওয়ার্ক : জেনেভা ক্যাম্প ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। ছোট ছোট খুপরি, চা ও পান-সিগারেটের দোকানের আড়ালে চলছে মাদকের ব্যবসা।

ক্যাম্পের বাসিন্দাদের ভাষ্য, বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম ও সৈয়দপুরিয়া বাবু এই তিনজনের গ্রুপই বর্তমানে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ ছাড়া ভাঙ্গারি আরজু, তোতে, কামরান, সাজু, আদিল ও ফাইজান, গালকাটা মনু, শাহ আলম, ইমতিয়াজ, আকরাম চোরওয়া জানু, বিল্লু, সাবু, বাশির, ইরফানসহ আরো কয়েকটি গ্রুপ ক্যাম্পজুড়ে সক্রিয়।

ক্যাম্পের একাধিক বাসিন্দা জানান, এমন কোনো মাদকদ্রব্য নেই, যা এখানে মিলবে না। ঢাকায় যে কয়টি স্পট মাদক কারবারের জন্য কুখ্যাত এর মধ্যে একটি এই ক্যাম্প। দীর্ঘদিন ধরে রাজু, মোল্লা আছাদ, রাজা ও শাহজাদা নামের দুই ভাই, খোরশিদ ও তার মেয়েজামাই রাজু, মুন্না, ফকিন্নি কাল্লু, পাপ্পু ও তার ছেলে রাসেল, ছোট রাজু, বড় রাজু, আতিক ও তার মা রেহানা, চুয়া সেলিম, তুতে, তার শ্যালক রানা, বালম ও তার ভাই তাবলচি আসলাম ও গালকাটা মনু ক্যাম্পে তাদের নিজস্ব লোকজন দিয়ে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও সহযোগিরা এখনও প্রকাশ্যে কতিপয় পুলিশকে অর্থ দিয়ে মাদক ব্যবসা করছে।

ক্যাম্পের বাসিন্দারা বলছেন, মাদক কারবারিদের মধ্যে ফকিন্নি কাল্লু দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের সোর্স হিসেবে পরিচিত। এ ছাড়া মোল্লা মেহতাব ও মোল্লা বশির নামের আরো দুজনসহ আরো অনেকে এখনও পুলিশের সোর্স মাদক কারবারে জড়িত বলে জানা গেছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পে মাদক নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা অব্যাহত আছে। এরই মধ্যে একাধিক অভিযান চালিয়ে অনেক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

CPM NETWORK

আর্কাইভ

রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি
 ১২৩
৪৫৬৭৮৯১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১
SEO Solution Lab
©somakalerpata
Developer Design Host BD