সরকারের উদ্যোগ ও বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ব্যবস্থার ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পূর্বাবস্থায় ফিরবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজে (বিআইআইএসএস) ‘বাংলাদেশে জ্বালানি নিরাপত্তা : সংকট ব্যবস্থাপনা থেকে স্থিতিস্থাপক জ্বালানি রূপান্তর’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, আমরা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি। জনগণের ভোগান্তির বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করি। কারণ, আমরা এমন কোনো সরকার নই যারা সবকিছু ধামাচাপা দিয়ে এমন এক কাল্পনিক আখ্যানের গল্প তৈরি করবে। যার পরিণতিতে শেষ পর্যন্ত বেলুন ফেটে যাওয়ার মতো বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার কারণে বাংলাদেশের জনগণ ও উদ্যোক্তাদের প্রতি আমরা অবশ্যই সহানুভূতিশীল। এটি একটি ব্যর্থতা।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমানে গ্যাসের চাহিদা হলো ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি। আর সরবরাহের পরিমাণ ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ এমএমসিএফডির মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি আসছে দেশীয় উৎস থেকে এবং ১ হাজার এমএমসিএফডি আসছে এলএনজি থেকে।
তিনি আরও বলেন, অপেক্ষমাণ আবেদনসহ মোট চাহিদা হলো ৫ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই চাহিদা মেটাতে সরকার এরইমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারের উদ্যোগ ও বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ব্যবস্থার ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পূর্বাবস্থায় ফিরবে
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ফেব্রুয়ারিতে আমাদের সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এমন এক উত্তরাধিকার পেয়েছিলাম যা ছিল ভঙ্গুর, আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত এবং কাঠামোগতভাবে দিকনির্দেশনাহীন।
তিনি বলেন, আমাদের সরকার যখন এই বিদ্যুৎ খাতের দায়িত্ব নেয়, তখন এটি ছিল সম্পূর্ণ ভঙ্গুর ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত; পাশাপাশি এতে কোনো কৌশলগত দিকনির্দেশনাও ছিল না।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দীর্ঘদিনের কাঠামো এবং এর সঙ্গে যুক্ত তীব্র পদ্ধতিগত অদক্ষতা আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি ফাঁদ তৈরি করেছিল। বর্তমানে আমরা যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি, তা আসলে একটি ফাঁদ; আর এই ফাঁদটি পূর্ববর্তী সরকার আমদানিনির্ভরতার মাধ্যমে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তৈরি করেছিল।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বজনপ্রীতি, ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর আধিপত্য এবং আমদানিনির্ভরতা গভীরভাবে শিকড় গেড়েছিল। আর এখন আমরা সেই পুঞ্জীভূত সমস্যারই মাশুল দিচ্ছি। ঋণের ভারে আমাদের অর্থনীতি নুয়ে পড়ছে, আমরা এমন এক পরিস্থিতির মোকাবিলা করছি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, শুধুমাত্র গত কয়েক মাসের সংকটের সময় গ্রিড সচল রাখতে আমাদের অতিরিক্ত ৩২ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা জোগান দিতে হয়েছে। তাছাড়া, ফোর্স মেজেওর বা অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে—বিশেষ করে কাতারগ্যাসের সরবরাহজনিত সমস্যার ফলে প্রাকৃতিক গ্যাসের যে তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে, তা সামাল দিতে আমরা স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কিনতে বাধ্য হচ্ছি।
তিনি বলেন, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট; যার ফলে কেবল ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাই এই সময়েই জ্বালানি তেল বিক্রিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমরা যখন দায়িত্ব গ্রহণ করি, তখন বাংলাদেশে মাত্র ১৭ দিনের চাহিদার সমপরিমাণ ডিজেল মজুত ছিল। গত কয়েক মাসে জোরদার ও সমন্বিত সংগ্রহের মাধ্যমে আমরা সফলভাবে জাতীয় ডিজেল মজুত ৩২ দিনের চাহিদার সমান পর্যায়ে উন্নীত করেছি এবং আমরা ৯০ দিনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার লক্ষ্যেও জোরগতিতে কাজ করে যাচ্ছি।
‘একইসঙ্গে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং ব্যবস্থাটি চালু করার ক্ষেত্রে বর্তমানে অপারেটর বা পরিচালনাকারী নিয়োগের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে। কাঞ্চনপুর থেকে ঢাকা বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পর্যন্ত জেট ফুয়েল পাইপলাইনটি এই নভেম্বরেই চালু হতে যাচ্ছে, যার ফলে জ্বালানি খালাস সংক্রান্ত জটিলতা ও পরিবহন বা লজিস্টিকস খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে,’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিআইআইএসএস-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আ স ম রিদওয়ানুর রহমান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
স্বাগত বক্তব্যে বিআইআইএসএস-এর মহাপরিচালক উল্লেখ করেন যে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় সক্ষমতা ও সহনশীলতা এসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো জ্বালানি নিরাপত্তা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জটি কেবল বিদ্যুৎ বা জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয় নয়, বরং সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও টেকসই প্রাথমিক জ্বালানি নিশ্চিত করার বিষয়ও বটে। তিনি সংকট মোকাবিলার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সক্ষমতা ও সহনশীলতা অর্জন, আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনা এবং স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পরিবর্তে কৌশলগত পরিকল্পনার দিকে অগ্রসর হওয়ার ওপর জোর দেন।
এ ছাড়া, তিনি অভ্যন্তরীণ জ্বালানি অনুসন্ধান, কৌশলগত মজুদ গড়ে তোলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার, গ্রিড ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরেন।
সেমিনারে বিআইআইএসএস-এর গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবির, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জনাব মঞ্জুর আলম প্রধান এবং ইএসটেন্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এজাজ হোসেন বক্তব্য দেন।