জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন ঢাকার বিভিন্ন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে, বিশেষ করে কাস্টমস ঢাকা দক্ষিণ ও পশ্চিম এবং ভ্যাট কমিশনারেটের উত্তর-পূর্বসহ বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনকে কেন্দ্র করে অননুমোদিত মধ্যস্থতা, কথিত দালালচক্রের তৎপরতা এবং প্রভাব বিস্তারের অপচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী মহলের কেউ কেউ।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি দপ্তরের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে একটি স্বার্থসংশ্লিষ্ট চক্র বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী বা কথিত দালালচক্র তৈরি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে। এ চক্রের কিছু ব্যক্তি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য দপ্তরে অপেক্ষা করেন। তবে দাপ্তরিক ব্যস্ততার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ না পেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁরা ঊর্ধ্বতন মহলে অভিযোগও করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন কৌশলে কাস্টমস কমিশনারেটের সদর দপ্তর ও বিভাগীয় দপ্তরের কর্মকর্তাদের নামে, কখনো পরিচয় প্রকাশ করে আবার কখনো বেনামে, অভিযোগ দাখিল করে থাকেন। এ ধরনের অভিযোগের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হতে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হলে তা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত না হয়ে কোনো অভিযোগকে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা কিংবা তার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে হয়রানি করা উচিত নয়।
এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে, অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা, প্রমাণ ও প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।
বিশেষ করে রাজধানীর বিভিন্ন কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারেটের সদর দপ্তর এবং বিভাগীয় কার্যালয়ের কর্মকর্তারা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নথিপত্র, রাজস্ব হিসাব, আমদানি-রপ্তানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক বিষয় নিয়ে কাজ করেন। এসব দায়িত্ব পালনের সময় প্রতিটি আবেদনকারী বা ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে সাক্ষাৎ করা সব সময় সম্ভব হয় না।
ব্যবসায়ী মহলের কারও কারও অভিযোগ, দাপ্তরিক ব্যস্ততার কারণে কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ না পেয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি ক্ষুব্ধ হয়ে পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেন। তবে এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক ব্যস্ততা রাজস্ব বিভাগের স্বাভাবিক কার্যক্রমেরই অংশ বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।
ব্যবসায়ী মহল আরও উল্লেখ করেন, কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অসদাচরণে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে অভিযোগের যথাযথ যাচাই-বাছাই, সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিধিবিধান অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ধারণা, মৌখিক বক্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের পরিবর্তে প্রাসঙ্গিক নথিপত্র, গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন ব্যবসায়ী মহলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, দালালচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি নিজেদের কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা আইনজীবী হিসেবে পরিচয় দিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কর্মকর্তাদের সঙ্গে অযথা সময় কাটানোর চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে তাঁরা মনে করেন।
ব্যবসায়ী মহলের উত্থাপিত উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কোনো বহিরাগত ব্যক্তি বা মধ্যস্থতাকারী বিভিন্ন কৌশলে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারেন। এ ধরনের প্রচেষ্টায় সফল না হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁরাই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দালালচক্রের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে দাপ্তরিক সময় নষ্ট হওয়া, রাজস্ব আদায়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। দাপ্তরিক কাজে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোনো মধ্যস্থতাকারী কাজ করছেন কি না, সে বিষয়টিও যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক থাকা জরুরি।
বিশেষ করে কাস্টমস ঢাকা দক্ষিণ ও পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্বসহ সংশ্লিষ্ট কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কর্মকর্তাদের কথিত দালালচক্রের তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ক থাকার জন্য ব্যবসায়ী মহলের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তবে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিয়ম, অসদাচরণ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে হয়রানি করা কিংবা প্রমাণ ছাড়া কোনো কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ীর সুনাম ক্ষুণ্ন করাও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান জনাব আহসান হাবিবের প্রতি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী মহলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের বক্তব্য, ঢাকার কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারেটগুলোতে অননুমোদিত মধ্যস্থতা, সরকারি দপ্তরের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার এবং অভিযোগ দাখিলের প্রক্রিয়ার সম্ভাব্য অপব্যবহার সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি অভিযোগকারী, অভিযুক্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সরকারি দপ্তরের নাম বা পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁর পরিচয় ও কার্যক্রম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন ব্যবসায়ী মহলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।